![]() |
| বিলাসিতা ও পরনির্ভরশীলতা ছেড়ে আত্মনির্ভরশীলতাই হোক তরুণ প্রজন্মের হাতিয়ার: একটি বিশেষ বিশ্লেষণ |
জাকের হোসেন সুমন
(তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী)
বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নাগরিক হিসেবে এখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। বিলাসিতা কমিয়ে দিয়ে উদ্যোগক্তা হওয়াটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বাঞ্চনীয় হয়ে পড়েছে। আমরা যাপিত জীবনে এমন এক অদ্ভুত সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠছি, যেখানে একটি সার্টিফিকেটের আশায় মূল্যবান ৪ বছরের জায়গায় ৬-৭ বছর নষ্ট করতেও দ্বিধা করছি না। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার আকুল আহ্বান—পরনির্ভরশীল সার্টিফিকেটের মোহে অন্ধ না থেকে নিজেই উৎপাদক বা উদ্যোক্তা হয়ে যান না কেন?
১. পরনিন্দা ও পরনির্ভরশীলতার সংস্কৃতি
আমরা সব সময় সরকারের দোষ খুঁজে পেতে অভ্যস্থ। কিন্তু বাস্তবতা কি আমরা ভেবে দেখেছি? সরকার যদি চীন বা জাপানের মতো কয়েক বছরের জন্য গ্রাজুয়েট প্রোডাকশন বন্ধ করে দিয়ে উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে চায়, তবে সবচেয়ে বড় বাধা আমরা নাগরিকরাই হবো। আমরাই তো তখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করে দেবো, তাই না? সরকার চেষ্টা করেনি, এই কথা বলা পুরোপুরি ঠিক হবে না। করোনা পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সরকার চেয়েছিল এমন কিছু উদ্যোগ নিতে, যা আমাদের আত্মনির্ভরশীল করবে, কিন্তু আপনাদের বা আমাদের নেতিবাচক আন্দোলনের চাপে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলশ্রুতিতে, আমরা বেকারত্বের তকমা গলায় ঝুলিয়ে সার্টিফিকেটের অর্জন নিয়ে গর্ব করে বসে আছি। আরে ভাই, মানুষ কর্ম করলে তবেই তো দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে!
২. সোশ্যাল মিডিয়া ট্রলিং বনাম বাস্তব উৎপাদনমুখী উদ্যোগ
সম্প্রতি বেগুনি ও মিষ্টি কুমড়া নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য নিয়ে দেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক হইচই ও মাতামাতি চলছে। ফেসবুকে যেন ট্রল বা বিপ্লবের এক নতুন উৎসব শুরু হয়েছে! বাহ্, কি আনন্দ আজ আকাশে বাতাসে! কিন্তু বিষয়টাকে কি অন্যভাবে ভাবা যায় না?
ফেসবুকে বেগুন নিয়ে ট্রল বা হাস্যরসে সময় নষ্ট না করে আপনি যদি নিজের উদ্যোগে ১০টি বেগুনের গাছ লাগান, যেখানে খরচ হয়তো বড়জোড় ২০০ টাকা হবে, তাহলে তো আপনার পারিবারিক চাহিদা মিটে যাবে। তখন আপনি চাইলে বেগুনি, বেগুন ভাজা, কিংবা বেগুন ভর্তা সবই বানিয়ে খেতে পারবেন। এখন এভাবে যদি অনেক মানুষ মিলে নিজ নিজ আঙিনায় ৫-৭টা করে বেগুনের গাছ লাগায়, তাহলে তো বাজার থেকে বেগুন কেনার প্রয়োজন নেই। এতে বাজারে বেগুনের চাহিদা কমবে এবং দাম এমনিতেই কমে যাবে। ১০ টাকা কেজি বললেও চাহিদা না থাকায় কেউ কিনবে না। এই যে ভিন্নধর্মী কিছু করার প্রচেষ্টা, একেই তো প্রকৃত দেশপ্রেম বলা যেতে পারে। এমন ছোট ছোট উদ্যোগ দেশে একটা মোটামুটি অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে।
৩. কাজের কাজ না করে অকাজের পেছনে ছোটাছুটি
আজকাল আমরা কাজের কাজ না করে অযথা ইস্যু বা অকাজের পেছনে বেশী ছুটোছুটি করছি। ফালতু কাজে সময় নষ্ট করছি। যেভাবে বর্তমান পরিস্থিতি চলছে, তাতে যদি দেশের সকল কর্মকান্ড এভাবেই চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশ শ্রীলংকার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে খুব বেশি দূর নেই। অলরেডি অনেক অর্থনীতিবিদ এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ফেসবুক ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনারা ইস্যুর অপেক্ষায় পড়ে থাকেন, তাতে উন্নত বিশ্বের মানুষ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। আপনারা খালি ইস্যু খোঁজেন বলেই কতিপয় দুষ্ট লোকরা বিভিন্ন ইস্যু তৈরী করে নিজেদের ফায়দা লুটে নিচ্ছে। আরে ভাই, সব ইস্যু নিয়ে আপনাকে কেন কথা বলতে হবে? কেন ফেসবুকে পোস্ট দিতে হবে? কিছু ইস্যু ছেড়ে দেন না, দেখবেন ইস্যু সৃষ্টি হওয়া এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
দেশপ্রেম যদি এতই থাকে, তবে দেশের বিরুদ্ধে বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুলাইন লিখার আগে চিন্তা করবেন। দেশ পরিচালকরা খারাপ হলেই দেশ খারাপ হয়ে যায় না। দেশের বিরুদ্ধে কিছু বলার আগে দেশের জন্য নিজের অবস্থান থেকে কিছু করে দেখান।
৪. হুযুগে বাঙালী ও অলসতার তকমা
আচ্ছা বলেন তো, 'টিপ ইস্যু' কি কোনো ম্যাটার হতে পারলো? কিন্তু আপনারা সোশ্যাল মিডিয়ায় পক্ষে-বিপক্ষে বড় আন্দোলন শুরু করে দিয়েছেন। আপনাদের এসব পাগলামি কর্মকান্ড দেখে বিশ্ব অলরেডি ভাবা শুরু করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশে অলস মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। যে দেশে অলস মানুষের সংখ্যা ও দুর্নীতি বেশি, সেখানে মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশন হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা অল্প দিনে কোটিপতি হওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজি, কোনো কষ্ট না করেই। এজন্য সবার ওস্তাদ 'ইউটিউব' আছে। বিশ্বাস না হলে দেখেন গিয়ে ইউটিউবে শর্টকাট কোটিপতি হওয়ার ট্যাগের ভিডিওতেই সবচেয়ে বেশি ভিউ হয়।
আমরা আসলে 'হুযুগে বাঙালী'। খালি সুযোগ খুঁজি, কিন্তু সুযোগের উত্তম ব্যবহার করতে শিখিনি এখনো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

Post a Comment
আপনার সু-চিন্তিত মতামত জানাবেন।