![]() |
| মাস গেলে বিল দেবো, অথচ সারাদিন বিদ্যুৎ থাকবে না! এটা কি মগের মুল্লুক? |
জাকের হোসেন সুমন
(তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী)
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যখন দেখি প্রতি মাসে কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করার পরও সারাদিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাতে হয়, তখন মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আসলেই কোনো নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করছি, নাকি এটা কোনো ‘মগের মুল্লুক’?
সম্প্রতি সারাদেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন কর্মসূচি ও আন্দোলনের কারণে দেশের অধিকাংশ গ্রামে যে অমানবিক লোডশেডিং শুরু হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করেও সাধারণ মানুষকে কেন বারবার এমন জিম্মি অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে?
১. অজুহাতের শেষ নেই: ভোগান্তিতে শুধুই সাধারণ মানুষ
আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের অজুহাতের যেন কোনো শেষ নেই। একেক সময় একেক অজুহাত সামনে এনে জনগণকে চরম কষ্টে ফেলে রাখা হয়:
কখনো জ্বালানি সংকট: বলা হয় তেল বা গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
কখনো বকেয়া দেনা: সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা আমদানিকৃত বিদ্যুতের দেনা পরিশোধ না করার অজুহাত দেওয়া হয়।
কখনো আন্দোলন বা কর্মসূচি: আবার কখনো বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের কর্মসূচির কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা সরবরাহ ব্যাহত করে রাখা হয়।
জনগণ তো নিয়মিত বিল দিচ্ছে, তাহলে তাদের কেন এত অজুহাত শুনতে হবে? তেলের সংকট, সরকারের দেনা কিংবা কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ দাবি-দাওয়ার খেসারত কেন দিনশেষে অবাধ্য গ্রাহকদেরই দিতে হবে?
২. পল্লী বিদ্যুতের আন্দোলন ও গ্রাহক জিম্মি করার সংস্কৃতি
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ন্যায়সংগত দাবি থাকলে তারা তা সরকারের সাথে আলোচনা করে সমাধান করতে পারেন। কিন্তু সেবা বন্ধ রেখে, কোটি কোটি গ্রামীণ মানুষকে বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে রেখে আন্দোলন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গ্রামের কৃষক, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ পরিবারগুলো আজ চরম অসহায়। তীব্র গরমে অসুস্থ রোগী ও শিশুরা ছটফট করছে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, আর ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎকে জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচনা না করে সাধারণ মানুষকে এভাবে জিম্মি করা কোনো দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে পড়ে না।
৩. গণতান্ত্রিক অধিকার বনাম প্রশাসনিক ব্যর্থতা
একটি গণতান্ত্রিক দেশের মূল ভিত্তি হলো জনগণের মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ ও হাহাকার দেখার যেন কেউ নেই।
মাস শেষে ঠিকই মোটা অঙ্কের বিলের কাগজ হাতে পৌঁছে যায়, কিন্তু বিল পরিশোধের বিনিময়ে যে ন্যূনতম নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাওয়ার কথা, তা থেকে দেশের মানুষ চরমভাবে বঞ্চিত। আল্লাহ ছাড়া আজ যেন এ দেশের মানুষের এই কষ্ট দেখার আর কেউ নেই।
শেষ কথা ও আমাদের দাবি
আমরা কোনো অরাজকতা বা অস্থিতিশীলতা চাই না; আমরা চাই সমস্যার দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি:
১. জরুরি ভিত্তিতে সমাধান: পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের দাবির বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করুন।
২. জরুরি সেবায় কঠোর নীতি: সেবা বন্ধ রেখে জনগণকে জিম্মি করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
৩. জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের অজুহাত বন্ধ করে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দিন।
জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই চরম ভোগান্তি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আকুল আহ্বান জানাচ্ছি।

Post a Comment
আপনার সু-চিন্তিত মতামত জানাবেন।