![]() |
| ফেসবুক কি আজ নোংরামি আর ভিউ বাণিজ্যের হাট? |
জাকের হোসেন সুমন
(তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী)
আমাদের দেশে যদি প্রশ্ন ওঠে—সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনটি? উত্তরটি নিঃসন্দেহে 'ফেসবুক'। মেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষের দিকে সারা বিশ্বে যে কয়টি দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে তৃতীয়। দেশে প্রায় সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি মানুষ এই মাধ্যমটি ব্যবহার করছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশের বেশি।
যে মাধ্যমটির যাত্রা শুরু হয়েছিল পারস্পরিক সামাজিক যোগসূত্র তৈরি করতে, কালক্রমে তা সংবাদ পরিবেশন, শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের ভার্চুয়াল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এক বিশাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ সেই ফেসবুকই চরম বাক-স্বেচ্ছাচারিতা, নোংরা রুচি এবং অন্ধ ভিউ-বাণিজ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
১. সুস্থ চিন্তার বিদায় ও ‘নীরব দর্শকের’ ভিড়
আজকের ফেসবুকের দিকে তাকালে দেখা যায়—সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ আর দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে যাচ্ছে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, সত্য সংবাদ এবং রুচিশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বিগত রাজনৈতিক শাসনকালে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ও হয়রানির কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক বিবেকবান মানুষ ফেসবুক থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানুষ যখন ফেসবুক ব্যবহার করে এক নতুন, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই স্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী এই মাধ্যমটিকে তাদের অপপ্রচারের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলল।
বাক্স্বাধীনতা বনাম চরম স্বেচ্ছাচারিতা: বাক্স্বাধীনতার নামে যা খুশি তা-ই বলা এবং ছড়ানোর সংস্কৃতি চালু হয়েছে।
মব জাস্টিস ও বিচারহীনতা: তথ্য প্রমাণের ধার না ধুরে ফেসবুকেই একেকজনকে 'সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল'-এর মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মোরাল পুলিশিং: ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ব্যক্তিজীবনের ওপর কুৎসিত আক্রমণ চালাচ্ছেন কিছু চরমপন্থী বা ক্ষতিকর ইউজার।
বিবেকবানদের নিরবতা: এই নোংরা পরিবেশ দেখে সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ আজ নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে অথবা ফেসবুক বর্জন করছে। তাদের এই অনুপস্থিতির সুযোগেই জায়গা দখল করে নিয়েছে কুচক্রী ও নোংরা মানসিকতার মানুষেরা।
২. ‘যত ভিউ, তত বাণিজ্য’: ধসে পড়া মূল্যবোধ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুস্থ বিনোদন বা বস্তুনিষ্ঠ শিক্ষার জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে সস্তা ক্লিকবেইট শিরোনাম, মনগড়া খবর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও। যাচাই-বাছাই না করে দ্রুত এসব কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়া ও সত্য-মিথ্যার তোয়াক্কা না করার মূল চালিকাশক্তি একটাই—“যত ভিউ, তত উপার্জন”।
বাণিজ্যের ফাঁদে পড়ে বিনোদন বা তথ্যের নামে সমাজকে যা উপহার দেওয়া হচ্ছে, তা কেবল নোংরামি ও কুসংস্কারই বাড়াচ্ছে না, বরং আমাদের আগামী প্রজন্মকে এক রুচিহীন ও বিভ্রান্তিকর মানসিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপনে কোনো নৈতিকতার বালাই নেই, কন্টেন্টে নেই সামান্য শিষ্টাচার বা সামাজিক শিষ্টাচারের ছোঁয়া। সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ব্যবসা করাটাই যেন এখানকার টিকে থাকার মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. সমাধান দূরে সরে থাকা নয়, চাই শুভশক্তির পুনরুত্থান
সাড়ে ছয় কোটি মানুষের এই সুবৃহৎ প্ল্যাটফর্মকে আমরা এভাবে পচে যেতে দিতে পারি না। ফেসবুক আজ বাংলাদেশের বাস্তব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই সমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে নীরবতা ভেঙে শুভশক্তিকে সামনে আসতেই হবে।
একজন তরুণ সমাজকর্মী হিসেবে আমার স্পষ্ট বার্তা: নিজেদের গুটিয়ে রাখা বা দূরে সরিয়ে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না।
বিবেকবান ও রুচিশীলদের প্রত্যাবর্তন: যারা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বোঝেন এবং যেকোনো সংকটকালে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন, তাদের দ্রুত এই সামাজিক প্ল্যাটফর্মে সরব হতে হবে।
কুৎসিত কন্টেন্ট বর্জন ও প্রতিরোধ: নোংরা তথ্য, বানোয়াট খবর ও ট্রোলিংয়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রিপোর্ট ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সত্যের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়া: অপপ্রচার আর মিথ্যার জৌলুশ সাময়িক হলেও, শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়। তাই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার রেখে ইতিবাচক ও প্রগতিশীল চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে।
শেষ কথা
আমাদের নীরবতার সুযোগেই কিন্তু অসত্য, গুজব ও রুচিহীনতা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তরুণদের যদি এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখতে হয়, তবে ভার্চুয়াল জগতের এই 'ডিজিটাল জঙ্গল' পরিষ্কার করার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।
আসুন, নীরবতার সামাজিক খাঁচা ভেঙে ফের সোচ্চার হই। ফেসবুকের এই বাণিজ্যের ভিড়ে সত্য, সুন্দর ও রুচিশীল চেতনার এক নতুন জাগরণ ঘটাই।

হারিয়ে যাওয়াদের মাঝে আমিও একজন!!
ReplyDeleteদীর্ঘদিন থেকেই ফেসবুকে অনুপস্থিত, আপনার আহ্বান ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করছি!
ReplyDeleteআসলে আমরা ভেতর থেকে পচে গেছি, সমাজ টা কেবল এখন উপর থেকেই সুন্দর।
Delete