![]() |
| বিপ্লবের পর শুধুই কি মুখের পরিবর্তন? অপসংস্কৃতির বৃত্তে বন্দি গণমানুষের স্বপ্ন |
জাকের হোসেন সুমন
(তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী)
ছাত্রজনতার রক্তক্ষয়ী ও নজিরবিহীন সফল বিপ্লবের পর সমগ্র দেশবাসীর মতো আমিও বুকভরা আশা বেঁধেছিলাম। ভেবেছিলাম, বহু বছর ধরে চেপে বসা জুলুম, অন্যায় এবং ক্ষমতার দাপটের অবসান ঘটে এবার দেশে একটি ইতিবাচক ও স্থায়ী পরিবর্তন আসবে। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম—অন্তত গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা থেকে রাজনীতির নামে গড়ে ওঠা অমানবিক সংস্কৃতি, হিংসা এবং একের পর এক হয়রানিমূলক হামলা-মামলার কালো অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হবে।
ভেবেছিলাম, ক্ষমতার মোহে পাড়ায় পাড়ায় ভাইয়ে-ভাইয়ে বা এক বন্ধুর সাথে অন্য বন্ধুর যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটবে। নির্বাচনের সময় প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়া, বাড়িঘর ভাঙচুর করা কিংবা রাজনৈতিক বিষবাষ্প ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের শান্তিময় জীবন বিঘ্নিত করার সংস্কৃতি থমকে যাবে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়—বিপ্লবোত্তোর বাংলাদেশে এসে আমাদের সেই রঙিন স্বপ্নগুলো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
১. ব্যবস্থার পরিবর্তন বনাম মুখের রদবদল
বিপ্লবের এত বড় অর্জনের পর আজ যখন চারপাশে তাকাই, তখন এক গভীর হতাশা আমাদের ঘিরে ধরে। যে অপসংস্কৃতি, হিংসা, দখলদারি এবং ক্ষমতার দাপট নির্মূলের জন্য দেশের হাজার হাজার তরুণ রাজপথে নেমেছিল—সেই কাজগুলো কিন্তু বন্ধ হয়নি। বন্ধ হওয়ার বদলে কেবল 'চরিত্র বা পক্ষগুলোর পরিবর্তন' ঘটেছে!
পুরোনো চর্চায় নতুন মুখ: আগে যারা নির্যাতন চালাত, আজ কেবল তারা সরে গিয়ে নতুন কিছু মানুষ ঠিক একই কায়দায় প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হচ্ছে।
সেই একই হয়রানি: পাড়ায় পাড়ায় সেই একই শত্রুতা, ভাঙচুর এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপ আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে।
আমরা চেয়েছিলাম গোটা পচা-গলা রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিকে বদলে ফেলে একটি পরমতসহিষ্ণু ও মিলেমিশে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অপসংস্কৃতিগুলো ঠিকই থেকে গেছে, কেবল চালকের আসনে বসা মানুষগুলো বদলে গেছে।
২. শহীদ ও আহতদের ত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা
আজকের এই হতাশাজনক চিত্র দেখার পর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় বিপ্লবে প্রাণ দেওয়া সেই অকুতোভয় শহীদ এবং হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করা হাজারো আহত ছাত্রজনতার জন্য। তারা কি নিজেদের জীবন ও তাজা রক্ত কেবল কিছু সুবিধাবাদী মানুষের ভাগ্য বদলানোর জন্য দিয়েছিল?
যে স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে হাজারো মানুষ বুলেট ও টিয়ারশেলের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, সেই আত্মত্যাগ আজ চরম সংকটে। সাধারণ মানুষের মুক্তি তো আসেনি, বরং কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এই বিপ্লবকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
যে ত্যাগের বিনিময়ে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বদলে আবারও পুরোনো অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি করা শহীদদের রক্তের সাথে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।
৩. তরুণ সমাজের হতাশা ও আমাদের ভবিষ্যৎ
বিপ্লবের মূল কারিগর ছিল এ দেশের সাধারণ তরুণ ও ছাত্রজনতা। আজ সেই সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ চরমভাবে হতাশ। আমরা যদি এখনই এই প্রতিহিংসার রাজনীতি ও দখলদারির অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের প্রজন্ম আর কখনো কোনো পরিবর্তনের আন্দোলনে বিশ্বাস রাখবে না।
শেষ কথা
পরিবর্তন মানে কেবল ক্ষমতার চেয়ারের পরিবর্তন নয়; পরিবর্তন মানে দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি ও আচরণের পরিবর্তন। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আমার স্পষ্ট বার্তা—
১. প্রতিহিংসা বন্ধ করুন: রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হামলা, মামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুরের অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
২. সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করুন: যারা বিপ্লবের নাম ভাঙিয়ে পুরোনো জুলুমের পুনরাবৃত্তি করছে, তাদের সামাজিকভাবে বয়কট ও আইনের আওতায় আনতে হবে।
৩. ঐক্য ও সহনশীলতা: গ্রামে-গঞ্জে এবং পাড়ায়-পাড়ায় হিংসা ভুলে পারস্পরিক মিলেমিশে থাকার আবহ তৈরি করতে হবে।
আমরা কোনো দলের বা গোষ্ঠীর সুবিধাবাদের জন্য রাজপথে নামিনি; আমরা নেমেছিলাম একটি মানবিক ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে এই সুবিধাবাদী চক্রের অপসংস্কৃতি রুখে দিয়ে প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা করতেই হবে।

Post a Comment
আপনার সু-চিন্তিত মতামত জানাবেন।