![]() |
| প্রেম, রোমাঞ্চ ও এক লরি-মার্কা ধমকের গল্প |
চরিত্র:
এটি একটি কাল্পনিক প্রেমের গল্প। এর সকল চরিত্র কাল্পনিক।
১. প্রেম, রোমাঞ্চ ও এক লরি-মার্কা ধমকের গল্প
বিকেল গড়িয়ে তখন মধ্য-শরতের সোনাঝরা আলো ছড়িয়ে পড়ছে রমনা পার্কের বুকে। পার্কের ঠিক মাঝখানটায় যে নীলচে পানির শান্ত দিঘিটা আছে, তার ঠিক পূর্ব পাড়ের একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চে একা বসে আছে জয়। সামান্য দখিনা বাতাসে দিঘির বুকজুড়ে এক ধরণের চপল অলৌকিক ঢেউ খেলছিল, আর তাতে পড়ন্ত বিকেলের মিঠে রোদ লেগে মনে হচ্ছিল অজস্র সোনালী তারা বুঝি সাঁতার কাটছে।
দৃশ্যটা বড্ড মোহনীয়। জয় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। স্বভাবতই নিভৃতচারী আর ভীষণ শান্ত প্রকৃতির ছেলে জয়। পেশায় নামজাদা এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বেশ ওপরের সারির এক্সিকিউটিভ, মাস গেলে মোটা অঙ্কের বেতন পায়। চার মাস আগে সেগুনবাগিচায় একতলার একটা সুন্দর ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে উঠেছে তারা। ওর পরিবারে আছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর বাবা, পরম স্নেহময়ী মা, আর সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিতে ভর্তি হওয়া ছোট বোন মারিয়া। জয় এমনিতে অত্যন্ত সুপুরুষ, তবে অন্তর্মুখী স্বভাবের হওয়ায় মেয়েদের সামনে গেলেই এক ধরণের আজব নার্ভাসনেসে ভোগে।
কিন্তু আজকের অলস বিকেলটায় দিঘির ওই রূপ দেখে জয়ের মনের ভেতর আচমকা একটা গুঞ্জরণ শুরু হলো। নিজের অজান্তেই সে মৃদু সুরে গুনগুন করে গাইতে লাগল— "তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা..."
জয়ের গানের গলা দুর্দান্ত। তবে সে কেবল একাই গায়। গানটা যখন মাঝামাঝি পৌঁছেছে, ঠিক তখনই এক বিশাল দুর্যোগের মতো সেই সুর কেটে চুরমার হয়ে গেল!
"Excuse Me Mr. Joy Gopal!"
উচ্চগ্রামের চিৎকারে কেঁপে উঠল আশপাশের চড়ুই পাখির দল। লরির বিকট হর্নের চেয়েও প্রখর সেই গলার আওয়াজে চমকে উঠে পেছনে তাকাল জয়। আর তাকানো মাত্রই তার হৃৎপিন্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ভূত দেখার মতো ভীতি আর বিস্ময় নিয়ে সে লাফিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য!
লাবণ্য হলো জয়দের বাড়ির ফ্ল্যাট মালিকের একমাত্র মেয়ে। যেমন রূপ, তেমনই তার অসম্ভব জেদ আর দাপট! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। রূপের বর্ণনায় বলতে গেলে—টানা টানা দুটো চোখ, কাঁচা কলাপাতা রঙের গায়ের রঙ আর মুখে এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি। সে সবসময় জয়কে উত্যক্ত করার সুযোগ খোঁজে আর আদর করে নাম দিয়েছে ‘জয় গোপাল’।
লাবণ্য দুই হাত কোমরে দিয়ে ভুরু কুঁচকে দাঁড়াল, "বলি ও মিঃ জয় গোপাল! কখন থেকে পেছনে এসে দাঁড়িয়ে আছি তা কি খেয়াল আছে? এসে দেখি আপনি একদম দেওয়ানা হয়ে কার যেন চিন্তায় বুঁদ হয়ে গান গাইছেন! কী ব্যাপার? মনটা কোন পাখির খাঁচায় বন্দি হলো শুনি?"
জয় ভিজি বেড়ালের মতো তোতলাতে তোতলাতে বলল, "জ্বী... আপ—মানে তুমি... মানে আপনি কখন এলেন?"
"আসলাম তো বহুক্ষণ!" লাবণ্য এক পা এগিয়ে এসে আদেশের সুরে বলল, "আর কতদিন বলছি আমি আপনার চেয়ে ছোট, আমাকে 'তুমি' বলবেন? আপনি আপনি করে মাথাটা গরম করবেন না তো!"
লাবণ্যর ধমকে জয়ের শার্টের ভেতর দিয়ে এক ফোঁটা ঠান্ডা ঘাম নেমে গেল। মনে মনে ভাবল, ‘বাবারে বাবা! এই পিচ্চি মেয়েটার গলায় এত জোর আসে কোত্থেকে? পুলিশে যোগ দিলে দারুণ কাজ দিত!’
মুখে কিছু না বলে জয় অপরাধীর মতো অপরাধী মুখে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
লাবণ্য চেঁচিয়ে বলল, "কী ব্যাপার? মনে মনে কী বিড়বিড় করছেন? মুখে কি তালা দেওয়া নাকি? কথা বলতে কি কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা আছে?"
"না না! নিষেধাজ্ঞা থাকবে কেন?" জয় হাঁসফাঁস করে বলল, "আসলে... আমি বুঝতে পারছি না আপনাকে—মানে তোমাকে কী বলব!"
"কী বলবেন মানে? আপনাকে কি চামচ দিয়ে খাইয়ে শিখিয়ে দিতে হবে?" লাবণ্য চোখ গোল গোল করল, "আপনার মাথা বলবেন! ভদ্রলোকের মতো জিজ্ঞাসা করুন আমার নাম কী, আমি কী করতে ভালোবাসি, আমার পছন্দের রং কী, কিংবা আমার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী!"
জয় চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে আমতা আমতা করল, "কিন্তু... এগুলো তো আমি জানি!"
"কী জানেন আপনি?"
"এই যে তোমার নাম লাবণ্য, তুমি ঢাবিতে পড়ো, জয়ের বাবাদের বাসার ল্যান্ডলর্ড তোমার বাবা..."
"আর আমার পছন্দ-অপছন্দ, আমার হৃদয়ের গোপন লক্ষ্য—এগুলো জানেন না কেন?" লাবণ্য একধাপ এগিয়ে এল।
জয় ভয়ার্ত চোখে বলল, "এগুলোও কি জানতে হয় নাকি?"
"অবশ্যই জানতে হয়!" লাবণ্য চোখ রাঙাল, "নইলে কীভাবে বুঝবেন আপনি কার প্রেমে পড়তে যাচ্ছেন?"
কথাটা বলেই লাবণ্য হুট করে খেয়াল করল সে কী বলে ফেলেছে। তবে সামলে নিয়ে বলল, "ধ্যাৎ! বড্ড বেশি কথা বলেন আপনি। সরুন তো, বেঞ্চের মাঝখানে নদের চাঁদের মতো বসে আছেন কেন? একপাশে সরুন!"
জয় ভাবল এটাই হয়তো পালানোর উপযুক্ত সময়। সে সুবোধ বালকের মতো উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু লাবণ্য তার নরম অথচ শক্ত হাত দিয়ে জয়ের হাত চেপে ধরে সজোরে হিঁচড়ে আবার বেঞ্চে বসিয়ে দিল।
"কী ব্যাপার? উঠে চম্পট দেওয়া হচ্ছিল কোথায়? আমি এখানে একা বসে বসে কাশবনের হাওয়া খাব নাকি? বসুন বলছি!"
জয়ের ডান হাতের কবজিতে লাবণ্যর হাতের ছোঁয়া তখনও টাটকা। একটা অদ্ভূত বিদ্যুৎ তরঙ্গ যেন জয়ের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। সে ভয়ে আর লজ্জায় একদম আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। বাতাস বইছে বেশ মিষ্ট, কিন্তু জয়ের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।
লাবণ্য ওর ঘাম দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল, "কী অদ্ভুত লোক বাবা! হাত ধরলাম আর অমনি বরফের মতো জমে গেলেন? কথা বলুন তো! আমি আপনার ফ্যাকাশে মুখ দেখতে পার্কে আসিনি।"
২. ১০ টাকার বাদাম আর ৫০০ টাকার নোট
ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল এক খুদে বাদামওয়ালা। ছেলেটার মাথায় তোয়ালে প্যাঁচানো, হাতে কাঠের বাক্সে ভাজা চিনাবাদাম।
বাদামওয়ালা জয়ের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, "মামা, কাঁচা বাদাম নিবেন? আম্মা তো খুব শখ কইরা বসে আছে, দশ টাকার বাদাম কিইন্যা দেন না!"
জয় বিষম খাওয়ার উপক্রম হয়ে বাদামওয়ালার দিকে তাকাল, "এই ছেলে! আমি তোমার মামা হলাম কবে থেকে? আর উনি তোমার আম্মা হতে যাবেন কেন?"
বলতে বলতেই পাশে লাবণ্যর দিকে চোখ পড়তেই জয়ের কন্ঠ আবার পেটের ভেতর ঢুকে গেল। লাবণ্য হিংস্র বাঘিনীর মতো তাকিয়ে আছে।
"কী হলো, চুপ করে গেলেন কেন?" লাবণ্য বাঁকা হেসে বলল, "কিনুন বাদাম! আমি বাদাম খাব।"
জয় তড়িঘড়ি করে মানিব্যাগ বের করল। কিন্তু পকেট ঘেঁটে দেখল এক জঘন্য বিপদ! ব্যাগে কোনো ৫, ১০ বা ৫০ টাকার নোট নেই। আছে শুধু নতুন চকচকে ৫০০ আর ১০০০ টাকার কড়কড়ে নোট।
জয় অপরাধীর মতো ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে বাদামওয়ালাকে দিল।
বাদামওয়ালা চোখ কপালে তুলে বলল, "ও মাগো! এত ট্যাকার ভাঙতি তো আমার কাছে নাই মামা! এই সকেলে মাত্র দশ ট্যাকার বাদাম বেচছি!"
জয় হতাশ হয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, "তাহলে বাদাম নিয়ে যাও ভাই। আমার কাছে ছোট নোট নেই।"
লাবণ্য সঙ্গে সঙ্গে গর্জাল, "থামুন! কী করা হচ্ছেটা কী? বাদাম ফিরিয়ে দিচ্ছেন কোন দুঃখে?"
জয় অসহায় মুখে বলল, "Sorry... আমার কাছে ভাঙতি নেই তো!"
"তাতে কী হয়েছে? এসব অজুহাত আমার কাছে চলবে না।" লাবণ্য নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা কচকচে ৫০ টাকার নোট বের করে বাদামওয়ালাকে দিল, "এই নাও ভাই, ওকে ১০ টাকার বাদাম দাও আর বাকি ৪০ টাকা রেখে দাও।"
বাদামওয়ালা আনন্দিত হয়ে পটাপট এক ঠোঙ্গা বাদাম লাবণ্যর হাতে দিয়ে চলে গেল।
লাবণ্য বাদামের ঠোঙ্গাটা সোজা জয়ের কোলের ওপর ছুঁড়ে মারল, "নিন, আপনার কাছে ধার দিলাম। কড়ায় গণ্ডায় সুদে-আসলে পরে ফেরত নেব। আর শুনুন, আমার হাতে কিন্তু এখন বাদাম দেওয়া যাবে না। আমি নিজে বাদাম ভাঙতে পারি না, নখ ভেঙে যায়। আপনি একটা একটা করে খোসা ছড়িয়ে আমার হাতের তালুতে দেবেন, আর আমি খাব। খবরদার! আপনি যদি নিজের মুখে একটা বাদামও পুরেছেন, তবে আপনার আজকে আর আস্ত সেগুনবাগিচা ফেরা হবে না!"
জয়ের চোখ গোল গোল হয়ে গেল, ‘কী বলে এই মেয়ে? আমি এখন পার্কে বসে একজন পূর্ণবয়সী মেয়েকে নিজ হাতে বাদাম ছিলে ছিলে খাওয়াব? মানুষ দেখলে কী ভাববে?’
জয় সাহস সঞ্চয় করে বলল, "দেখো লাবণ্য, এসব কিন্তু বাড়াবাড়ি। আমি পারব না। তুমি নিজেই ভেঙে খাও।"
কথাটা বলা মাত্রই লাবণ্য তার ডান চোখের ভুরুটা টিপিক্যাল ভিলেনদের মতো ওপরের দিকে তুলে জয়ের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টির মাঝে এমন এক প্রাণঘাতী হুমকি ছিল যে জয়ের সব বীরত্ব ধুলোয় মিশে গেল।
সে আর টু শব্দটি না করে একটা একটা করে বাদাম নিয়ে খোসা ছাড়াতে লাগল, আর পরম ভক্তিতে লাবণ্যর বাড়িয়ে দেওয়া নরম হাতের তালুতে রাখতে লাগল। লাবণ্য একটা করে বাদাম মুখে দিচ্ছে, আর জয়ের বেকুব মার্কা চেহারা দেখে মনে মনে মুচকি মুচকি হাসছে।
দিঘির পানিতে তখন সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে। চারপাশের কোলাহল কিছুটা শান্ত।
হঠাৎ লাবণ্য জয়ের একদম মুখের কাছে ঝুঁকে এসে বলল, "এই যে মিঃ জয় গোপাল! একটা সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে পার্কে বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডা দেওয়া হলো, এবার কি বাসায় ফেরার ইচ্ছা আছে? নাকি এখানেই নাইট গার্ডের চাকরি নেবেন?"
জয় চোখ বড় বড় করে বলল, "আমি তো কতক্ষণ আগেই চলে যেতে চেয়েছিলাম! তুমিই তো যেতে দিলে না!"
"ধ্যাৎ! আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন।" লাবণ্য শাঁ করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
জয় আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে উল্টো হাঁটা দিল। পার্কের মেইন গেটে এসে একটা খালি রিকশা ডেকে উঠতে যাবে, অমনি পেছন থেকে আবার সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"ভাঙতি টাকা আছে তো? নাকি রিকশাওয়ালাকেও ৫০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে কান্নাকাটি করবেন?"
জয় পেছনে ফিরে চমকে উঠে দেখল, লাবণ্য কখন যেন তার ছায়ার মতো পিছু পিছু গেট পর্যন্ত চলে এসেছে! জয়ের অসহায় চেহারা দেখে লাবণ্য আর কথা না বাড়িয়ে নিজের হাত থেকে একটা ১০০ টাকার নোট জয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
জয় নিঃশব্দে টাকাটা নিল। রিকশায় উঠে বসার পর যখন রিকশা চলতে শুরু করল, জয় পেছনে ফিরে দেখল—পার্কের গেটে দাঁড়িয়ে লাবণ্য এক হাত তুলে তাকে টা-টা দিচ্ছে, আর তার মুখে ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত জাদুকরী মিষ্টি হাসি!
৩. কলার চেপে ধরে রিকশায় টান
কয়েকদিন পর।
সন্ধ্যাবেলা জয় অফিস শেষ করে হেঁটে হেঁটে রমনা পার্কের পাশ দিয়ে বাসায় ফিরছিল। সারা দিনের খাটাখাটনির পর জয়ের মেজাজটা একটু ক্লান্ত ছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশ থেকে ঝঙ্কার ভেসে এল—
"এই যে মিঃ জয় গোপাল! চোরদের মতো মুখ নিচু করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?"
জয় থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল, একটা চলন্ত রিকশায় বসে আছে লাবণ্য। আজ সে পরেছে লাল রঙের একটা সুতির সালোয়ার কামিজ, কানে দুলছে রূপোলী রঙের ঝুমকো। পরন্ত রোদের শেষ আলোটা যখন ওর মুখে এসে পড়েছে, জয় যেন মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
‘মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে?’ জয়ের মনে এই প্রথম প্রশ্নটা জাগল।
কিন্তু ওর সেই ঘোর বেশিক্ষণ টিকল না। লাবণ্য তার রিকশাটা জয়ের একদম গা ঘেঁষে থামিয়ে চিৎকার করে উঠল, "কী ব্যাপার? হাঁ করে পেঁচার মতো তাকিয়ে থাকবেন, নাকি রিকশায় উঠবেন?"
জয় ঢোক গিলে ব্যাকফুটে গিয়ে বলল, "না না! আমি... আমি তো হেঁটে যেতেই ভালোবাসি। হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।"
লাবণ্য মুখ বেঁকিয়ে বলল, "হয়েছে হয়েছে! রিকশা ভাড়া বাঁচানোর ফন্দি, তাই না? নাকি আজও পকেটে সেই ৫০০ টাকার কড়কড়ে নোট? আর ধার নিলে যে মানুষ পরিশোধ করে, সেই সাধারণ জ্ঞানটা কি আপনার মাথায় নেই?"
জয় লজ্জিত হয়ে বলল, "ছি ছি! কী বলছ তুমি? আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে হেঁটেই সেগুনবাগিচায় ফিরি। একটু শরীরচর্চা হয়।"
"আর বাহানা করতে হবে না!" লাবণ্য এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে জয়ের শার্টের কলার ধরে সজোরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল!
আচমকা ধাক্কায় জয় সোজা এসে পড়ল রিকশার সিটে, ঠিক লাবণ্যর গা ঘেঁষে!
জয় ভীতি আর বিস্ময়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠছিল, "এ কী! তুমি তো ভীষণ বিপজ্জনক মেয়ে! কলার ধরে টেনে তুললে কেন?"
"চুপ!" লাবণ্য দাপটের সাথে ধমকে উঠল। তারপর জয়ের ডান হাতটা টেনে নিয়ে নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে রাখল।
জয় হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, "ছাড়ো লাবণ্য! রাস্তায় মানুষজন দেখছে তো!"
"একদম সোজা হয়ে বসে থাকুন!" লাবণ্য চোখ রাঙাল, "নইলে চলন্ত রিকশা থেকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দেব, তখন বুঝবেন মজা!"
জয়ের মুখ চুন হয়ে গেল। সে ভাবল, ‘এই মেয়ের যা ছাট, সত্যি সত্যিই হয়তো ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে। তার চেয়ে চুপচাপ থাকা ভালো। অন্তত মাঝরাস্তায় মান-সম্মানটা তো বাঁচবে!’
পুরো রাস্তায় আর কেউ কোনো কথা বলল না। জয় ভয়ে ও লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে সিটের এক কোণে সিঁটিয়ে রইল, আর লাবণ্য জয়ের হাতটা চেপে ধরে ওর কাঁধে হালকা মাথা হেলিয়ে মনে মনে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
রিকশা এসে সেগুনবাগিচায় ওদের ভবনের সামনে থামল। জয় রিকশা থেকে নেমেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
নেমে লাবণ্যর দিকে তাকাতেই লাবণ্য বলল, "কী? এভাবে আমকাঠের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? একটা মেয়ের সাথে একই রিকশায় চড়ে এলে ভাড়া কি মেয়েটা দেবে নাকি? দিন টাকা বের করুন!"
জয় দ্রুত মানিব্যাগ বের করে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিল।
কিন্তু এবার লাবণ্য রিকশায় বসেই চেঁচিয়ে উঠল, "কী মুশকিল! আমি কি সারারাত রিকশাতেই বসে থাকব? আমি তো নামতে পারছি না! আসুন, হাত ধরে আমাকে নামান!"
জয় মনে মনে বলল, ‘এই মেয়ে আস্ত একটা ধান্ধাবাজ! যে মেয়ে শার্টের কলার ধরে টেনে রিকশায় তুলতে পারে, সে রিকশা থেকে নামতে পারে না—এ কথা ছাগলেও বিশ্বাস করবে না!’
তবুও ঝামেলা এড়াতে জয় হাত বাড়িয়ে দিল। লাবণ্য জয়ের হাত স্পর্শ করতেই চট করে লাফিয়ে নিচে নেমে পড়ল। নেমে সোজা জয়ের দিকে এক নজর না তাকিয়ে হনহন করে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
জয় নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে কলিং বেল বাজাল। দরজা খুলল জয়ের ছোট বোন মারিয়া। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়েই মারিয়া কানের লতি চেপে ধরে হাসিতে ফেটে পড়ল।
জয় মুখ গম্ভীর করে ভেতরে ঢুকে বলল, "কী রে মারিয়া? তোর হঠাৎ মির্চির গুঁড়ো নাকে গেল নাকি? এভাবে অকারণে হাসছিস কেন?"
মারিয়া চোখ মারল, "ভাইয়া! আমি বেলকনি থেকে সব দেখেছি!"
জয়ের বুকটা ধক করে উঠল, "কী... কী দেখেছিস?"
"তুমি যে আজকে লাবণ্য আপুর সাথে একদম রোমান্টিক হিরোর মতো একই রিকশায় কলার ধরে হাত ধরাধরি করে নামলে! দাঁড়াও, আমি এখনই গিয়ে আম্মুকে বলছি..."
জয় এক লাফে এসে মারিয়ার মুখ চেপে ধরল, "খবরদার মারিয়া! যা ভাবছিস তা একদম ভুল! ওই মেয়েটা একটা ডাকাত! আমাকে জোর করে কলার ধরে রিকশায় তুলে এনেছে!"
মারিয়া মুখ ছাড়িয়ে নিয়ে হেসে বলল, "আহা ভাইয়া, আমাকে এত কচি খুকি ভেবো না তো! তুমি যদি আমার ব্ল্যাকমেইল থেকে বাঁচতে চাও, তবে একটা শর্ত আছে।"
"কী শর্ত?"
"লাবণ্য আপুকে খুব জলদি আমার ভাবি বানিয়ে আমার ঘরে আনতে হবে! ব্যস, আর কিছু জানি না!"
জয় মাথায় হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়ল, ‘একদিকে ল্যান্ডলর্ড কন্যা, অন্যদিকে নিজের বোন—সব কটা মিলে আমার জীবনটা একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলল!’
৪. নিরিবিলি ফ্ল্যাট আর এক কাপ বিষাক্ত প্রেম
পরদিন সকালে জয়ের পরিবারে এক জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলো। জয়ের টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে থাকা দাদু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই জয়ের বাবা, মা আর মারিয়াকে জরুরি ভিত্তিতে মির্জাপুর যেতে হচ্ছে। অফিসে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের কাজ থাকায় জয় যেতে পারল না। দু'দিনের জন্য সে একাই সেগুনবাগিচার ফ্ল্যাটে রয়ে গেল।
দুপুরের আগেই অফিসে জয়ের জরুরি মিটিংটা শেষ হয়ে গেল। বস খুশি হয়ে সবাইকে আর্লি লিভ দিয়ে দিলেন। জয় তার এক সহকর্মীর সাথে কাছের "কড়াই গোস্ত" রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিল।
বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ জয়ের মনে পড়ল—সকালে যাওয়ার সময় তার মা বলে গিয়েছিলেন, "জয়, দুপুরে আর রাতে লাবণ্যদের ফ্ল্যাট থেকেই খাবার খেয়ে নিবি, আমি আন্টিকে বলে রেখেছি।"
জয় বাসায় এসে লিফট থেকে নামতেই দেখে লাবণ্য ওদের ফ্ল্যাটের গেটে দাঁড়িয়ে চাবি দিয়ে তালা খুলছে। জয়কে অসময়ে দেখে লাবণ্য বেশ অবাক হলো, তবে তার চোখে এক চিলতে খুশির ঝিলিক খেলে গেল।
"Hi Mr. Joy Gopal! আজকের সূর্য কি কোনদিকে উঠেছিল শুনি? এত তাড়াতাড়ি বাসায় যে?"
জয় মৃদু হেসে বলল, "অফিসের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই চলে এলাম।"
"ভালো করেছেন। লাঞ্চ করেছেন তো?"
"হ্যাঁ, বাইরে এক সহকর্মীর সাথে সেরে নিয়েছি।"
কথাটা শোনামাত্রই লাবণ্যর মুখের রঙ বদলে গেল! সে চোখ বড় বড় করে তেড়ে এল, "কী বললেন? বাইরে খেয়ে এসেছেন মানে? আপনার মা যে আমাদের বাসায় আপনার খাওয়ার ব্যবস্থা করে গেলেন, সেটা কি আপনার ওই পচা মাথায় ছিল না?"
জয় একটু পিছু হটে বলল, "আসলে... আমার একদম খেয়াল ছিল না..."
"কোনো কথা শুনতে চাই না!" লাবণ্য তর্জনী উঁচিয়ে ধমকাল, "রাতে যদি এই ভুলটা আবারও করেছেন, তবে আপনার কিন্তু জ্যান্ত কবর হয়ে যাবে বলে দিলাম! বুঝলেন?"
"হ্যাঁ... বুঝলাম," জয় ঘামতে ঘামতে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
সোফায় গড়িয়ে পড়ে টিভি রিমোটটা হাতে নিল জয়। কিন্তু টিভিতে কিছুই তার মন টানছিল না। সারাটা দিন আজ যেন অদ্ভূত কাটছে। জয় যতই চেষ্টা করছে কাজ বা অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে, বারবার লাবণ্যর সেই রাগী মুখ, লরি মার্কা ধমক আর রিকশায় চেপে ধরা হাতের ছোঁয়াটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
‘আচ্ছা, আমার কী হলো?’ জয় মনে মনে ভাবল, ‘মেয়েটা তো বড্ড বদমেজাজী, সবসময় ধমকের ওপর রাখে। অথচ এখন কেন ওর ওই ধমকগুলো শুনতেই এত ভালো লাগছে? ও কি সত্যিই আমার মনের ভেতর ঢুকে পড়ল?’
ঠিক তখনই দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল।
জয় গিয়ে দরজা খুলতেই চমকে উঠল। দরজায় হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য!
"কী ব্যাপার? দরজায় দাঁড়িয়ে আমকাঠের মতো তাকিয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসতে বলবেন না?"
"আরে এসো এসো! তুমি না বাইরে গেলে?"
"গিয়েছিলাম, আবার ব্যাক করেছি! কেন, আমার আসতে কোনো আইনি বাধা আছে নাকি? আপনার সমস্যা হলেও আমার বয়েই গেছে!" লাবণ্য সোজা ড্রয়িংরুমে গিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল।
"না না, সমস্যা হবে কেন?" জয় চশমাটা ঠিক করল।
"হুঁ! তা অতিথির বাসায় আগমন ঘটল, এক কাপ কফি অফার করবেন না? আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে।"
জয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, "কফি খাবে? দাঁড়াও, বানিয়ে আনছি।"
"আপনি কফি বানাতে পারেন নাকি?" লাবণ্য ভুরু নাচালো।
"হ্যাঁ, পারি।"
জয় কিচেনে গিয়ে যত্ন করে দুই মগ কোল্ড কফি বানাল। একটা মগ লাবণ্যর সামনে রেখে অপরটা নিয়ে মুখোমুখি সোফায় বসে টিভি দেখতে দেখতে কফিতে চুমুক দিতে লাগল।
কফি অর্ধেক শেষ হতেই জয়ের ফোন বেজে উঠল। মির্জাপুর থেকে তার মা ফোন করেছেন। জয় ফোনটা ধরে কথা বলতে বলতে বারান্দার দিকে গেল।
আর এই সুযোগে লাবণ্য এক পিশাচিক হাসি হেসে জয়ের কফির মগটার সাথে নিজের অর্ধেক খাওয়া কফির মগটা দ্রুত ওলটপালট করে পাল্টে নিল!
ফোন রেখে জয় ফিরে এল। আবার কফির মগে চুমুক দিল। লাবণ্য সোফায় বসে থুতনিতে হাত দিয়ে জয়ের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।
জয় অবাক হয়ে বলল, "কী হলো? এত হাসছ কেন?"
লাবণ্য উঁকি দিয়ে জয়ের মগের দিকে তাকিয়ে বলল, "কিছু না! আপনি কফি খান তো!"
‘আসলে লাবণ্য জয়ের এঁটো কফিতে চুমুক দেওয়ার আনন্দটা উপভোগ করছিল!’
কফি শেষ করে লাবণ্য সোফা থেকে উঠল, "চললাম! আমার কাজ আছে। আর শুনুন, রাত ৯টার মধ্যে আমাদের ফ্ল্যাটে চলে আসবেন। বেশি দেরি করলে দরজায় তালা মেরে ঘুমিয়ে পড়ব!"
৫. ছাদে প্রথম ছোঁয়া আর এক অদ্ভুত স্বীকারোক্তি
সন্ধ্যা নেমে এল সেগুনবাগিচায়।
আজকের আকাশটা মেঘলা, বাতাস বইছে বেশ শনশন করে। জয় ঘরের ভেতরের দমবন্ধ ভাব কাটাতে চারতলার ছাদে চলে এল। ছাদে ছোটখাটো একটা বাগান আছে, আর এক কোণে বসার জন্য চমৎকার একটা বাঁশের বেঞ্চ।
আজ মনটা জয়ের ভীষণ হালকা আর ফুরফুরে। সে গিয়ে বাঁশের বেঞ্চটায় বসল। পকেট থেকে বের করল একটা ব্র্যান্ডের সিগারেট আর লাইটার। এমনিতে জয় ধুমপান করে না। কেবল মারাত্মক মন ভালো থাকলে কিংবা গভীর কোনো চিন্তায় ডুব দিলে দু-এক টান দেয়।
সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে জয় যখন ধোঁয়া ছাড়ছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া ছায়ামূর্তি এসে সজোরে জয়ের হাত থেকে সিগারেটটা টান মেরে ছিনিয়ে নিল!
জয় পেছনে তাকিয়ে দেখে লাবণ্য!
আর দেখার পরেই জয়ের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! লাবণ্য জয়ের সেই জ্বলন্ত সিগারেটটা সোজা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরে এক টান দিল!
আর যায় কোথায়! পর মুহূর্তেই কাশি শুরু হলো লাবণ্যর। বিষম খেয়ে কাশত কাশত লাবণ্যর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল, মুখ লাল হয়ে গেল।
"কাহ্! কাহ্! ইশ! কী জঘন্য বিশ্রী গন্ধ!" লাবণ্য কাশি থামাতে পারছে না।
জয়ের ভেতরের সব ভয় এক সেকেন্ডে হাওয়া হয়ে সেখানে জায়গা নিল মারাত্মক এক রাগ আর উদ্বেগ!
জয় চ্যাঁচাল, "কী সমস্যা তোমার লাবণ্য? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুমি সিগারেট মুখে দিলে কেন?"
লাবণ্য কাশতে কাশতেই চোখ তুলে তাকাল, "আপনি... কাহ্... আপনি খাচ্ছিলেন তাই!"
"আমি খেলে তোমাকেও খেতে হবে নাকি? তুমি কি পাগল?"
লাবণ্যর কাশি থামছে না দেখে জয় আর নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারল না। সে হুট করে লাবণ্যর হাত দুটো ধরে টেনে তাকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল!
হঠাৎ এই উষ্ণ আলিঙ্গনে লাবণ্যর কাশি যেন জাদুমন্ত্রের মতো থেমে গেল। ছাদে তখন ঝোড়ো বাতাস বইছে। জয়ের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা লাবণ্য স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। আর জয়ের মনে হলো, সারা পৃথিবীর সমস্ত শান্তি আর সুখ যেন এই একটা অনুভূতির মাঝে লুকিয়ে আছে।
বুকের ভেতর লাবণ্যকে জড়িয়ে ধরেই জয় গম্ভীর গলায় বলল, "তুমি আর কখনো এসব ছাইপাশ ছোঁবে না, বুঝলে?"
লাবণ্য জয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "কেন?"
"কারণ এগুলো ভালো জিনিস না। শরীর খারাপ করে।"
"যা আপনার শরীর খারাপ করবে, তা আপনিও খেতে পারবেন না!" লাবণ্য জয়ের শার্ট চেপে ধরল।
"কেন?"
"আমার পছন্দ না তাই!"
জয় লাবণ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তোমার পছন্দ কি আমাকে সবসময় মেনে চলতে হবে?"
লাবণ্য এবার জয়ের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল। ওর চোখে তখন আর সেই লরি মার্কা চঞ্চলতা নেই, আছে এক গভীর মায়াবী আলো।
"হ্যাঁ, মেনে চলতে হবে।"
"কেন?" জয় আবার শুধাল।
লাবণ্য হালকা হেসে বলল, "কারণ আপনাকে যে আমার বড্ড বেশি পছন্দ হয়ে গেছে, মিঃ জয় গোপাল!"
কথাটা বলেই লাবণ্য হুট করে জয়ের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে একটু পেছনে সরে দাঁড়াল। তারপরই আবার তার পুরোনো বাঁকা হাসিটা ফিরে এল মুখে, "ওমা! আমাকে একা পেয়ে সুযোগ বুঝে একদম বুকে জড়িয়ে ধরা হচ্ছে, তাই না? আমি বুঝি কিছু বুঝি না?"
জয় মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে চশমাটা খুলে হাত দিয়ে চোখ কচলানো শুরু করল, "না... মানে... আমি তো তোমার কাশি হচ্ছিল দেখে..."
"থাক থাক! আর সাফাই গাইতে হবে না," লাবণ্য মিষ্টি হেসে বলল, "লজ্জা পেয়ে আর লাল হতে হবে না আপনাকে। মনে রাখবেন, রাত ৯টা! নিচে খাবেন। আমাকে যেন আর ছাদে এসে আপনাকে ধরে নিয়ে যেতে না হয়!"
লাবণ্য তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। জয় ছাদে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটি তখনও যেন লাবণ্যর শরীরের মিষ্টি সুবাস আর উষ্ণতা বয়ে বেড়াচ্ছে।
৬. সবুজ শাড়ি, মোমবাতির আলো আর রোমান্টিক রাত
রাত ঠিক কাঁটায় কাঁটায় ৯টা।
জয় নিজের চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে, একটা হালকা পারফিউম লাগিয়ে লাবণ্যদের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে কলিং বেলে চাপ দিল।
ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এল মিষ্টি এক কণ্ঠ—"আসছি!"
জয় থমকে গেল। গলার আওয়াজটা এত কোমল আর সুরেল যে মনে হলো কোনো সেতার বাজছে! কিন্তু লাবণ্য তো কথা বলে বাঘের মতো গর্জন করে, তবে কি অন্য কেউ?
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। আর দরজার ওপারে যা দাঁড়িয়ে ছিল, তা দেখে জয়ের পায়ের তল থেকে মাটি সরে গেল!
সামনে দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য। তবে আজকের লাবণ্য আর আগের কোনো লাবণ্যর সাথে মেলে না!
ওর পরনে গাঢ় সবুজ রঙের একখানা জামদানি শাড়ি, উন্মুক্ত কাঁধে এলিয়ে দেওয়া কুচকুচে কালো চুল, কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ, আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। শাড়ির আঁচলটা মেঝেষোঁয়া। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় তাকে ঠিক স্বর্গের কোনো অপ্সরী বলে মনে হচ্ছিল!
জয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখের পলক ফেলা বন্ধ হয়ে গেল।
লাবণ্য একটু নিচু হয়ে মিষ্টি হেসে বলল, "দরজাতেই কি সারারাত দাঁড়িয়ে থাকবেন মিঃ জয় গোপাল? নাকি ভেতরে এসে মন ভরে দেখবেন?"
জয় ভিজি বেড়ালের মতো তোতলালো, "S-Sorry... মানে..."
"It's totally okay! You are most welcome. আসুন ভেতরে, আমি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।"
জয় ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকল। ড্রয়িংরুমে কোনো বড় লাইট জ্বলছিল না, ডাইনিং টেবিলে দুটো সুগন্ধি মোমবাতি জ্বলছিল। ঘরজুড়ে এক মোহনীয় পরিবেশ।
জয় সোফায় বসতে বসতে ইতস্তত করে বলল, "আঙ্কেল-আন্টি কোথায়? উনাদের দেখছি না যে?"
লাবণ্য একটা চেয়ার টেনে জয়ের মুখোমুখি বসে বলল, "উনারা আব্বুর এক ফ্রেন্ডের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে গেছেন। ফিরতে ফিরতে মাঝরাত হবে।"
"ওহ..."
লাবণ্য নিজেই ডাইনিং থেকে খাবার এনে টেবিলে সাজাতে লাগল। ফ্রাইড রাইস, ক্রিসপি চিকেন ফ্রাই, আর ফ্রাইড প্রন। সব জয়ের ভীষণ পছন্দের খাবার!
জয় অবাক হয়ে বলল, "এগুলো তো আমার সব ফেভারিট ডিশ! তুমি কীভাবে জানলে?"
লাবণ্য রহস্যময় হেসে বলল, "মারিয়া আপুর কাছ থেকে জেনে নিয়েছি! এখন চুপচাপ বসে খাওয়া শুরু করুন তো!"
জয় টেবিলে বসল। লাবণ্য নিজে হাতে প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। জয় লজ্জা পাচ্ছিল লাবণ্যর সামনে একা একা খেতে।
লাবণ্য জয়ের লজ্জা দেখে বলল, "কী হলো? লজ্জা পাচ্ছেন নাকি? তাহলে আমি ওপাশের ঘরে গিয়ে বসব?"
জয় তড়িঘড়ি করে বলল, "না না! একদম না! তুমি সামনে বসে থাকো... আমার খুব ভালো লাগছে।"
লাবণ্য গাল লাল করে হেসে বলল, "তাহলে আরেকটু ফ্রাইড প্রন দিই?"
খাবার মুখে দিয়ে জয় চোখ বন্ধ করে ফেলল, "অসাধারণ! অবিশ্বাস্য রান্না! কে বানিয়েছে এগুলো?"
লাবণ্য অহংকারের সাথে নিজের দিকে আঙুল দেখাল, "আমি বানিয়েছি! কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না?"
"তুমি এত ভালো রান্না পারো? আমি তো ভাবতাম তুমি শুধু মানুষের ওপর ধমকাধমকিই করতে পারো!"
লাবণ্য চোখ পাকাল, "আবার বাজে কথা? আপনাকে নিজের হাতে ভালোবেসে রান্না করে খাওয়াচ্ছি, আর আপনি আমাকে অপমান করছেন?"
জয় চট করে লাবণ্যর একটা হাত ধরে ফেলল, "লাবণ্য, সত্যি করে একটা কথা বলবে?"
লাবণ্য চমকে উঠে জয়ের হাতের দিকে তাকাল, তারপর জয়ের চোখের দিকে।
"কী কথা?"
"আমাকে এত যত্ন করে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়ানোর কারণটা কী?"
লাবণ্য মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল। ডাইনিংয়ের মোমবাতির আলোয় ওর মুখটা আর টিপের চারপাশটা লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। এমন লাজুক, নম্র লাবণ্যকে জয় জীবনে প্রথমবার দেখছে!
লাবণ্য জয়ের হাতের মুঠোর ভেতর থেকে নিজের হাতটা না ছাড়িয়ে খুব মৃদুস্বরে বলল, "কারণটা তো আগেই ছাদে বলে এসেছি... আপনাকে যে আমার বড্ড বেশি পছন্দ হয়ে গেছে, মিঃ জয় গোপাল!"
পুরো ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জয় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে চেয়ার থেকে উঠে লাবণ্যর পাশে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর লাবণ্যর দু হাত ধরে তাকে দাঁড় করালো।
লাবণ্য জয়ের চোখের দিকে তাকাতেই জয়ের বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। জয় পরম মায়ায় লাবণ্যর কপালে লাল হয়ে যাওয়া টিপটার ঠিক ওপরে একটা গভীর ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল।
লাবণ্য চোখ বন্ধ করে সেই ছোঁয়া অনুভব করল।
ঘড়িতে তখন রাত ১১টা বাজল। সময় যেন ডানা মেলে উড়ে গেছে!
জয় হালকা হেসে বলল, "এবার আমাকে যেতে হবে লাবণ্য। সকালে অফিস আছে।"
লাবণ্য জয়ের শার্টের বোতাম ধরে হালকা টেনে বলল, "সকালে কিন্তু এখানেই ব্রেকফাস্ট করবেন, বুঝেছেন? না এলে কিন্তু অফিসে গিয়ে হানা দেব!"
জয় হেসে বলল, "ওকে ম্যাডাম! জাস্টিস ডেলিভারড!"
জয় দরজার দিকে এগিয়ে গেল। লাবণ্য দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। জয় নিজের ফ্ল্যাটের দরজায় চাবি দেওয়ার আগে পেছনে ফিরে তাকাল, "Good Night, লাবণ্য।"
লাবণ্য মিষ্টি হেসে হাত নাড়ল, "Good Night, আমার জয় গোপাল!"
৭. বাড়ির গেটে মিষ্টি হুমকি
পরদিন সকাল।
জয় অফিসের সুট-টাই পরে রেডি হয়ে লাবণ্যদের ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে নক করল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল আঙ্কেল আর আন্টি ডাইনিংয়ে বসে পেপার পড়ছেন আর চা খাচ্ছেন।
জয় হাসিমুখে বলল, "আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল, কেমন আছেন?"
আঙ্কেল পেপার নামিয়ে বললেন, "ওয়ালাইকুম আসসালাম জয় বাবা! এসো এসো, বসো। কাল রাতে আমরা আসতে বড্ড দেরি করে ফেলেছিলাম। তোমার কোনো অসুবিধা হয়নি তো বাবা?"
জয় বিনয়ের সাথে বলল, "না না আঙ্কেল! একদম অসুবিধা হয়নি। লাবণ্য খুব সুন্দর সব রান্না করেছিল।"
ঠিক তখনই কিচেন থেকে ট্রে হাতে এক মূর্তি আবির্ভূত হলো! লাবণ্য!
কিন্তু আজ আবার সে সেই পুরোনো চেনা দাপুটে রূপে!
লাবণ্য ট্রে-টা সজোরে টেবিলে রেখে চেঁচিয়ে বলল, "অসুবিধা হলে তো এক থাপ্পড় মেরে সোজা করে দিতাম! আবার কিসের অসুবিধা?"
আন্টি চোখ কপালে তুলে বললেন, "ছিঃ লাবণ্য! বড়দের সাথে এভাবে কেউ কথা বলে? কী অসভ্য মেয়ে বাবা তুমি!"
লাবণ্য কোমরে হাত দিয়ে বলল, "আমি তো এমনই! আমার জয় গোপাল কিছু মনে না করলেই হলো!"
জয় আর লাবণ্যর বাবা দুজনেই লাবণ্যর কথা শুনে বিষম খেলেন! জয় আড়চোখে লাবণ্যর দিকে তাকাল। দেখল লাবণ্য জয়ের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির এক চোখ মারছে!
জয়ের মুখে না চাইতেও একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। লাবণ্য জয়ের সেই বিরল হাসি দেখে থমকে গেল। এই প্রথম সে জয়কে নিজের সামনে এমন খিলখিল করে হাসতে দেখল! জয়ের হাসিতে যেন এক ধরণের অদ্ভুত মায়াময় আলো ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে।
জয় লাবণ্যর দিকে তাকাতেই লাবণ্য দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে রান্নাঘরের দিকে ভেগে গেল!
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে জয় আঙ্কেল-আন্টিকে সালাম জানিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেল। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সে লাবণ্যকে কোথাও দেখতে পেল না। মনটা একটু খারাপই হলো জয়ের।
কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে নিচতলার মেইন গেটে আসতেই জয়ের চোখ ছানাবড়া!
বাড়ির মেইন গেটে দুই হাত বুকের ওপর ধরে, দেওয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য!
জয় চমকে গিয়ে বলল, "তুমি এখানে কখন এলে? আমি তো ওপরে তোমাকে খুঁজছিলাম!"
লাবণ্য বাঁকা হেসে বলল, "কেন? আমাকে খোঁজা হচ্ছিল কেন?"
"এমনি..."
"এমনি কেউ কাউকে খুঁজে নাকি?" লাবণ্য এক পা এগিয়ে এল।
"না মানে..."
"আর মানে মানে করতে হবে না!" লাবণ্য জয়ের টাইটা হালকা ধরে নিজের দিকে টেনে এনে বলল, "আজ অফিস থেকে এক মিনিটও দেরি না করে সোজা বাসায় ফিরবেন। বিকেলে আমি কেনাকাটা করতে যাব, আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে!"
জয় হাঁসফাঁস করে বলল, "আমার আজ অফিসে খুব চাপ লাবণ্য! অনেক কাজ আছে!"
লাবণ্য জয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম হুমকি দিল, "আপনি যদি ঠিক বিকেল ৫টার মধ্যে বাসায় না পৌঁছেছেন, তবে আমি আপনার অফিসে গিয়ে সবার সামনে আপনাকে কলার ধরে টেনে শপিং মলে নিয়ে যাব! এবার আপনার ইচ্ছা—আপনি নিজে আসবেন, নাকি আমি গিয়ে নাটক করব!"
জয়ের চোখ গোল গোল হয়ে গেল। সে ভালো করেই জানে, এই পাগলী মেয়েটা মুখে যা বলে, কাজে তার চেয়েও দ্বিগুণ করে দেখাতে পারে! অফিসে গিয়ে কলার ধরলে তার কর্পোরেট ক্যারিয়ারের বারোটা বেজে যাবে!
জয় পরাজয় স্বীকার করে দ্রুত মাথা নাড়ল, "আসব! আমি ঠিক সময়ে চলে আসব!"
লাবণ্য জয়ের টাই ছেড়ে দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, "Good Boy! এবার যান, অফিসে গিয়ে মন দিয়ে কাজ করুন।"
জয় দ্রুত একটা খালি রিকশা ডেকে তাতে উঠে পড়ল। রিকশা চলতে শুরু করলে জয় পেছন ফিরে দেখল—লাবণ্য গেটে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাতাসে দোলাচ্ছে আর মিষ্টি হাসছে।
জয়ের মনে হলো, এই অদ্ভুত, বদমেজাজী আর অসম্ভব ভালোবাসায় ভরা মেয়েটার মিষ্টি হুমকিতে বন্দি হওয়াটাই বোধহয় তার জীবনের সেরা প্রাপ্তি!

Post a Comment
আপনার সু-চিন্তিত মতামত জানাবেন।