-->
seo-expert-in-bd-imam-uddin-imamuddinwp

জাকের হোসেন সুমন

তরুন লেখক ও সমাজকর্মী

অটো পাসের চেয়ে কি এই ফল ভালো হলো? মূল্যায়নের নামে শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন সংকট


অটো পাসের চেয়ে কি এই ফল ভালো হলো? মূল্যায়নের নামে শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন সংকট

জাকের হোসেন সুমন

(তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী)

২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে যখন এইচএসসি পরীক্ষায় 'অটো পাস' দেওয়া হয়েছিল, তখন তা ছিল এক নজিরবিহীন আপৎকালীন পদক্ষেপ। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা হওয়ার পর স্থগিত পরীক্ষাগুলো যেভাবে বাতিলের মুখে পড়ল এবং যেভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হলো, তা শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ফের গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। পরীক্ষা বাতিল করা কি সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীর মতের প্রতিফলন ছিল? নাকি মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষার্থীর ক্ষোভের মুখে তড়িঘড়ি নেওয়া সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হলো দেশের লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে?

১. পরিসংখ্যানের বৈপরীত্য ও 'অটো' মূল্যায়নের ধাঁধা

এ বছর সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার ৭৭.৭৮ শতাংশ, যা গত বছরের (৭৮.৬৪%) চেয়ে সামান্য কম এবং ২০২১ ও ২০২২ সালের উচ্চ পাসের হারের তুলনায় অনেকটাই কম। অর্থাৎ, ২০২০ সালের শতভাগ অটো পাসের পর এবারই সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ হলো, গতবারের চেয়ে এবার ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে!

এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো 'সাবজেক্ট ম্যাপিং' বা বিষয় সমন্বয়। এসএসসি বা পূর্ববর্তী পরীক্ষায় যারা ভালো করেছিল, এইচএসসি না দিয়েও তারা এবার অনায়াসে ভালো নম্বর পেয়ে গেছে। এসএসসির ১০০ নম্বরের ফলাফলকে স্রেফ দ্বিগুণ করে এইচএসসির ২০০ নম্বরের ফল হিসেবে বসিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি ২০২০ সালের 'অটো পাসের' চেয়ে খুব একটা ভিন্ন নয়। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত জাদুকরি, যা শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা বা জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটায় না।

২. শিখনফল ও শিক্ষার মানের মৌলিক সংকট

আমাদের দেশে স্কুল-কলেজ বা সরকারের কাছে শিক্ষার সার্থকতা মানে 'পাসের হার', আর অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছে সাফল্য মানে 'জিপিএ-৫'। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থী কতটুকু দক্ষতা অর্জন করল—যাকে 'শিখনফল' বলা হয়—তা যাচাই করার একমাত্র মাধ্যম ছিল নিরপেক্ষ পরীক্ষা।

এইচএসসি স্তরের একটি বিষয়ের গভীরতা আর এসএসসির বিষয়বস্তু এক নয়। এসএসসির রসায়নে ৮২ পাওয়া একজন শিক্ষার্থী এইচএসসিতে কোনো পরীক্ষা না দিয়েই ১৬৪ নম্বর পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই বিষয়ে এইচএসসি পর্যায়ে তার প্রকৃত দখল কতটুকু, তা পরিমাপের কোনো বৈজ্ঞানিক উপায় এতে রাখা হয়নি।

এমনকি উচ্চমাধ্যমিকে শাখা পরিবর্তন করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়মে নম্বর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী নিজেও এখন বিভ্রান্ত—সে কি সত্যিই ওই বিষয়ে পারদর্শী, নাকি এটি স্রেফ কাগজে-কলমে পাওয়া উপহার?

৩. উচ্চশিক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষায় তৈরি হওয়া বড় চাপ

উচ্চমাধ্যমিকের অর্জিত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় বা পেশাগত শিক্ষায় পা রাখে। কিন্তু এই কৃত্রিম ও অসম্পূর্ণ ফলাফল উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করবে:

  • বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জটিলতা: বুয়েট, মেডিকেল বা প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা বা নম্বর নির্ধারণ করবে, তখন এই 'সাবজেক্ট ম্যাপিং'-এর নম্বর তাদের চরম বিভ্রান্তিতে ফেলবে।

  • বিভাগ পরিবর্তনের সংকট: অনেক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান থেকে অন্য শাখায় যায় কারণ তারা এইচএসসি বিজ্ঞানে কাঙ্ক্ষিত নম্বর পায় না। এবার ঘরে বসেই এসএসসির দৌলতে বিজ্ঞানে উচ্চ নম্বর পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে।

  • বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্জিত ঘাটতি: পরীক্ষার মুখোমুখি না হয়ে উচ্চশিক্ষায় পা দেওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে গিয়ে পড়াশোনার বাড়তি চাপ ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ সামলাতে হিমশিম খাবে।

৪. ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি ও দায়িত্বশীলতার আহ্বান

যেকোনো আন্দোলন বা প্রশাসনিক সংকটে শিক্ষার্থীদের আবেগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র ও শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাজ হলো বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া। সামান্য চাপে নতিস্বীকার করে পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।

আমরা যদি পাসের হার আর জিপিএ-৫-এর পেছনে ছুটতে গিয়ে মূল শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা ও মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকেই নষ্ট করে দিই, তবে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের তরুণেরাই।

উপসংহার:

অটো পাসের বিকল্প হিসেবে যে 'সাবজেক্ট ম্যাপিং' দেওয়া হলো, তা আদতে এক বিভ্রান্তিকর মূল্যায়ন। ভবিষ্যতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও নীতি নির্ধারকদের মনে রাখতে হবে—পরীক্ষাহীন সনদ দিয়ে কোনো জাতিকে সমৃদ্ধির পথে নেওয়া যায় না। একই সাথে তরুণদেরও অনুধাবন করতে হবে যে, সাময়িক স্বস্তি বা পরীক্ষা এড়ানোর মানসিকতা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেই খর্ব করে।

Comments

আপনার সু-চিন্তিত মতামত জানাবেন।

Dark Template