-->
seo-expert-in-bd-imam-uddin-imamuddinwp

জাকের হোসেন সুমন

তরুন লেখক ও সমাজকর্মী

বাস্তবতার অপলাপ নাকি নাটক-সিনেমার স্বাধীনতা? গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিকৃতি বন্ধ হোক

বাস্তবতার অপলাপ নাকি নাটক-সিনেমার স্বাধীনতা? গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিকৃতি বন্ধ হোক

জাকের হোসেন সুমন

(তরুণ লেখক ও সমাজকর্মী)

আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী দুটি মাধ্যম হলো নাটক ও চলচ্চিত্র। দৃশ্যশ্রাব্য এই মাধ্যম দুটি কেবল বিনোদনের খোরাক জোগায় না, বরং দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমাজব্যবস্থাকে মানুষের সামনে হুবহু তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, একশ্রেণীর নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো বিষয়বস্তু তুলে ধরতে গিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গভীর বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন।

সংস্কৃতির বাস্তব রূপকে বিকৃত করে নিজেদের ইচ্ছেমতো কনটেন্ট বানানোর বিরুদ্ধে একজন সচেতন তরুণ হিসেবে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নির্মাতাদের প্রতি আমার স্পষ্ট বার্তা—আপনারা যদি গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে কোনো গল্প ফুটিয়ে তুলতে চান, তবে তাতে প্রকৃত গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটান। শহুরে জীবন দেখাতে চাইলে শহুরে বাস্তবতাই আনুন। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনাকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করলে সত্য ও সঠিক তথ্য তুলে ধরা আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব।

১. গ্রামীণ পোশাক ও চালচলনের বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন

আমাদের নাটক-সিনেমায় আধুনিক গ্রামীণ সমাজকে চরম বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাস্তবতার সঙ্গে চিত্রনাট্যের আকাশ-পাতাল তফাৎ চোখে পড়ে:

  • নারী চরিত্রের কৃত্রিমতা: গ্রামের একজন নারী বা তরুণী কোনো সময়ে কেমন পোশাক পরেন, তা নিয়ে নির্মাতাদের ন্যূনতম গবেষণা নেই। অনেক নাটকেই দেখা যায়, গ্রামের তরুণী চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীদের ওড়না ছাড়া আধুনিক পোশাক পরা কিংবা স্কুল ড্রেস পরে শহরের পার্কে আড্ডা দিতে। এটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের সাধারণ গ্রামের মেয়েদের স্বাভাবিক সংস্কৃতি বা জীবনযাত্রার সঙ্গে মেলে না।

  • পুরুষ চরিত্রের একঘেয়ে স্টিরিওটাইপ: অন্যদিকে, গ্রামের কোনো ছেলে বা পুরুষ চরিত্রকে উপস্থাপন করতে গিয়ে কেবল লুঙ্গি, গামছা কিংবা স্যান্ডো গেঞ্জিতে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। এটিও চূড়ান্ত অসত্য। আজকের গ্রাম কিন্তু বদলে গেছে। গ্রামের তরুণেরা কেবল লুঙ্গি-গামছা পরেই দিন কাটায় না; আধুনিক শার্ট, প্যান্টসহ সব ধরনের রুচিশীল পোশাকই তারা পরিধান করে।

২. অবকাঠামোর সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গি

নির্মাতাদের চোখে যেন 'গ্রাম' মানেই কেবল ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর, মাটির রাস্তা আর চরম দারিদ্র্যের প্রতীক। নিঃসন্দেহে গ্রামে কুঁড়েঘর রয়েছে, কিন্তু তার পাশাপাশি আধুনিক স্থাপত্যের পাকা ও আধা-পাকা ঘরবাড়িও আজ প্রতিটি গ্রামে বিদ্যমান। আধুনিক ছোঁয়া আর গ্রামীণ পরিবেশের সঠিক মেলবন্ধন না দেখিয়ে গ্রামকে একটি সেকেলে ও জরাজীর্ণ ফ্রেমে আটকে রাখার মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

৩. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রাজাকার চরিত্রের ঐতিহাসিক ভুল

সবচেয়ে দুঃখজনক ও বিপজ্জনক বিষয় হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক কনটেন্টগুলোতে ইতিহাসের বিকৃতি।

নাটক বা চলচ্চিত্রে যখনই কোনো রাজাকার চরিত্র তৈরি করা হয়, তখন কেবল দাড়ি রাখা, টুপি পরা এবং টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষকে দেখানোটা যেন একটা বাঁধাধরা নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ আমরা যদি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাস্তব ডকুমেন্টারি বা আলোকচিত্রগুলো পর্যালোচনা করি, তবে স্পষ্ট দেখতে পাই যে সেসময় রাজাকার বা শান্তি কমিটির লোকজন স্বাভাবিক সাধারণ পোশাকও পরিধান করত।

একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাক বা অবয়বকে ঢালাওভাবে কেবল রাজাকারের একক প্রতিকৃতি বানিয়ে দেওয়া কোনো শিল্প হতে পারে না। এটি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সততাকেও খাটো করে।

শেষ কথা

শিল্পের স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, কিন্তু তা সত্য ও বাস্তবতাকে বিকৃত করার লাইসেন্স দেয় না। শিল্প যখন বাস্তব জীবন ও ইতিহাস থেকে দূরে সরে গিয়ে সস্তা বিনোদনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়।

আমি দেশের সকল নাট্যকার, পরিচালক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি— ১. কনটেন্ট নির্মাণের আগে সঠিক গবেষণা ও তথ্য যাচাই করুন।

২. কাল্পনিক স্টিরিওটাইপ ভেঙে সমাজের সঠিক রূপটি ফুটিয়ে তুলুন।

৩. শিল্পচর্চায় পেশাদারিত্ব, সততা এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখুন।

আমাদের সংস্কৃতি আমাদের অহংকার। বিনোদনের নামে নিজ দেশের ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে বিকৃত করার এই ধারা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

Comments

আপনার সু-চিন্তিত মতামত জানাবেন।

Dark Template